Banalata Sen

Poet: Jibanananda Das
Translated by: Shomir Dass

For thousands of years have I been walking on the earth,
From the Ceylon sea, in the dark of night, to the sea of Malaya
Much have I roamed; in the gray world of Bimbisara, Asoka
Was I there; in more deep darkness, city of Vidarbha;
I, a weary soul, surrounded by life’s foamy ocean,
Was given a momentary bliss by Banalata Sen of Nator.

Her hair, dark like far back night of Vidisha
Her face, the carving of Sravasti; over the ocean too far
When the crew, lost his way being rudderless,
Sights the green grass land in cinnamon isle,
Thus have I seen her in darkness; asked she, “Where have you been so long”
Raising her bird’s nest like eyes, Banalata Sen of Nator.

After the long weary day with falling sound of dew
Falls dusk; kestrel wipes the smell of sun off  its wings;
After fading the colors of earth arranged manuscript
Then for stories fireflies sparkle into their flame;
All birds return– all rivers–  end life’s all proceedings
Remains only darkness, to sit facing Banalata Sen.

October 4, 2015
Khulna.

 

 

ভর্তিমেলা – ২০১৮

পাঁচ বছরের সকল শিশু ভর্তি হবে চলো
সোনার বাংলা গড়বে তুমি বাবা-মাকে বলো।

ব্যানার, পোস্টার, ড্রামসেট, ঝনঝনি, মাইক্রোফোন হাতে শিক্ষার্থীদের স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত হয় ডুমুরিয়া উপজেলার মাগুরখালী ও শরাফপুর ইউনিয়েনর সমন্বয়ে গঠিত বানিয়াখালী ক্লাস্টারের ২৬ টি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ক্যাচমেন্ট এরিয়া। শুরু হয় ৩ দিন ব্যাপি ভর্তিমেলার প্রথম দিন। সোনার বাংলা গড়ার আহ্বানে ৫ বছরের সকল ভাই, বোন, বন্ধুদের বিদ্যালয়ে ভর্তি হবার ডাকে ৩১ ডিসেম্বর ২০১৭ খ্রিঃ সকালেই শুরু হয় শিক্ষার্থীদের আনন্দ অভিযান, নতুনদের আহ্বান তাদেরই সঙ্গী হতে। এক দিন পরেই ১ জানুয়ারি, ২০১৮। নতুন বছর রাতের ওপারেই। নতুন বছরে নতুন বইয়ের ঘ্রানে নতুন বন্ধুদের অভিবাদনগানে আজ তারা উচ্ছ্বাসিত। দুই হাত তুলে আহ্বান করে:

ভাই বন্ধু বোন আমরা চলো স্কুলে যাই
নিরক্ষর থাকবো না আর এ সোনার বাংলায়।

শিশুদের এই উচ্ছ্বাস ছুয়ে যায় অভিভাবক, বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটি, স্থানীয় কমিউনিটি, শিক্ষকদের অন্তরকেও। তারাও বয়সের ভার ভুলে গিয়ে আনন্দে ভাসে। যোগ দেয় র্যা লিতে, শিশুদের সুরে সুর মেলায়:

আমার ছেলে আমার মেয়ে কোন বিভেদ নাই
পাঁচ বছরে পড়লে তারে স্কুলে পাঠাই।

র্যা লি শেষে শুরু হয় ভর্তি কার্যক্রম। প্রতিটি বিদ্যালয়ে খোলা হয় ভর্তি বুথ। সেখানে নতুন শিক্ষার্থীদের যত্নের সাথে ভর্তি করা হয় । এ সময়ে ভর্তি কার্যক্রমকে উৎসাহিত করার জন্য নতুন ভর্তিকৃত শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেওয়া হয় উৎসাহ উদ্দিপক পুরষ্কার ও আগামী কাল (১ জানুয়ারি) নতুন বই হাতে পাওয়ার আমন্ত্রণ। এই ৩ দিন ব্যাপি ভর্তি মেলার কার্যক্রম চলে ২ জানুয়ারি ২০১৮ খ্রিঃ তারিখ বিকাল ৪ টা পর্যন্ত। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ভর্তিমেলা চলাকালিন যে সকল শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছে তাদেরকে এবং তাদের অভিভাবকদেরকে এবং ভর্তিমেলায় সহযোগিতা করার জন্য সংশ্লিষ্ট সকলকে ধন্যবাদ জানান। এ সময়কালে যারা ভর্তি হতে পারে নাই তাদের অনিতিবিলম্বে ভর্তি হওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়ে তিনি ভর্তিমেলার সমাপ্তি ঘোষনা করেন।

ভর্তিমেলার এই কার্যক্রমটি পরিচালিত হয় সমীর কুমার দাশ, সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসার, ডুমুরিয়া, খুলনা এর নির্দেশনায়।

‘ভর্তিমেলা-২০১৮’ দৈনিক দক্ষিণাঞ্চল প্রতিদিন পত্রিকায় প্রকাশ: ৪ জানুয়ারি, ২০১৮ খ্রিঃ।

কী, কেন, কোথায়, কখন: প্রশ্নগুলো কোথায়?

এমন কোনো শিশু আছে যার প্রশ্নে মা-বাবা বিরক্ত হয় নি? এমন কোনো বাবা-মা আছে যারা সন্তানের প্রশ্নে বিরক্ত হয়ে তাকে ধমকে থামিয়ে দেয় নি। কথা বলতে শেখার পর ইঁদুরের মত দাঁতে ধার দেওয়ার ছলে সারাদিন মুখে বকবকানি চলেনি এমন অভিযোগ কে দিবে, কোন শিশুর বিরুদ্ধে? কী, কেন, কোথায়, কখন ইত্যাদি অভ্যস্ত বান্তর ও অবান্তর প্রশ্নের চর্বিত চর্বনে ফেনা ওঠেনি কোন শিশুর মুখে? স্বজন যেমন শিশুর কৌতূহলী প্রশ্নে বিরক্ত হয়েছে, তেমনি তার ভিতর জ্ঞানের তৃষ্ণাও দেখেছে, হয়েছে প্রশংসায় পঞ্চমুখ, ইঙ্গিত পেয়ে আশাবাদী হয়েছে ভবিষ্যতেরও। তখন তার পারিবারিক জীবন, পরিচিত জন যেমন সীমাবদ্ধ, তেমনি প্রশ্নগুলোও; তবুও সীমাহীন তার জিজ্ঞাসা।

৪-৫ বছর বয়স হলেই তাকে পাঠানো হচ্ছে বিদ্যালয়ে। সেখানে শিশু পারিবারিক পরিচিত জনের সীমা পেরিয়ে সুযোগ পাচ্ছে বিস্তর সঙ্গের এবং বিষয়ের। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্নের ক্ষেত্রগুলোর হচ্ছে সীমাহীন, জানার জগৎ হচ্ছে বিস্তৃত। এখানে তার সেই অভ্যস্ত বান্তর ও অবান্তর প্রশ্নের গতি হওয়ার কথা লাগামহীন ঘোড়ার মতো। এখন বিদ্যালয়ে শারীরিক ও মানসিক শাস্তি দেওয়া হয় না। শিক্ষকরা আরো বেশি বন্ধুত্বপূর্ণ। কিন্তু প্রকৃত চিত্রটি কেমন? নতুনকে জানবার সেই দুর্বার তৃষ্ণায় তাকে কতটা উদ্বুদ্ধ করছে এই নতুন পরিবেশ? তারা কতটা প্রশ্নমুখর বিদ্যালয়ে? বাবা-মায়ের মতো শিক্ষকেরাও কি বিরক্ত হচ্ছে শিশুর অনবরত প্রশ্নে? নাকি তারা ভুলতে বসেছে জী-স্যার, হ্যাঁ-স্যার এর উত্তরের মাঝে? পড়া দেওয়া, পড়ানো এবং উত্তর মুখস্ত করার মধ্য আবদ্ধ হয়ে নেই তো শিশুর যোগ্যতা ভিত্তিক জ্ঞান?

আমি বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখেছি, শিশুদের কাছে মুক্ত প্রশ্ন চেয়ে দেখেছি তাদের জানার আগ্রহ নেই, বা সে আগ্রহ তাদের মধ্যে সৃষ্টি হচ্ছে না, অথবা তারা হারাতে বসেছে তাদের সেই শিশুসুলভ অবান্তর কৌতূহলও। বিশিষ্ঠ প্রাবন্ধিক আবুল ফজলের ভাষায়, ‘জিজ্ঞাসা বন্ধ হওয়া মানে উত্তর না খোঁজা, সমস্যার মোকাবিলা করতে অস্বীকার করা মানে সমাধানের দিকে পিঠ ফিরে থাকা।’ (নির্বাচিত প্রবন্ধ, পৃ. ১২১)। আমাদের শিশুরা বিদ্যালয়ে বইয়ের পোকা হয়ে শুধু উত্তর মুখস্ত করছে। তারা সনদপত্র পেয়ে ফাইল ভারী করছে কিন্তু বাস্তব জীবন পরিচালনায় স্বদক্ষতায় থাকছে পিছিয়ে। তাদের সামনে শিক্ষক গাইড হিসেবে না থেকে ধরিয়ে দিচ্ছে গাইড বই। যাও বাবা পড়ে খাও। অত্ত চিন্তা করার কী আছে? গাইডে অনেক প্রশ্ন আছে, যোগ্যতার, অযোগ্যতার, কী নাই। তুমি একা ভেবে কত প্রশ্ন বের করবে? পরীক্ষায় এখন যোগ্যতা ভিত্তিক প্রশ্ন করে পরীক্ষার্থীকে যাচাই করা হয়। তাছাড়া, গাইড বই থেকে হুবহু প্রশ্ন আসছে পরীক্ষায়। এমনকি আনসিন কমপ্রিহেনশনও। সুতরাং জিজ্ঞাসা বন্ধ, মুখস্ত করো, পরীক্ষায় ঢালো, পাশ হয়ে যাবে। পড়তে ইচ্ছা না হয় অপেক্ষা করো, প্রশ্নতো ফাঁস হবে। সেগুলো দেখে যেও, হয়ে যাবে।

পৃথিবীর অন্যতম উন্নত দেশ জাপান পরিমান নয় শুধুমাত্র মানকে বিবেচনায় রেখে শিক্ষা ক্ষেত্রে এক অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। ৯ বছরের প্রাথমিক শিক্ষায় তাদের ভর্তির হার শতভাগ এবং এই গ্রেডে কোনো অশিক্ষিত শিশু নেই। শতকরা ৮৫ ভাগ শিশু বিদ্যালয়ে আনন্দবোধ করে। অথচ আমাদের দেশে শিশুদের বিদ্যালয়ে শতকরা ৮৫ ভাগ নিয়মিত করার জন্য উপবৃত্তি, স্কুল ফিডিংসহ কত রকমের আয়োজন করা লাগে। জাপানে শিক্ষার্থীরা শেখে খেলা আর আনন্দে আর আমরা তাদের গলধকরণে করি বাধ্য। জাপানে কোন ব্যক্তিকে সরকারী বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পেতে হলে ৪ বছর মেয়াদি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা কোর্স বা ২ বছর মেয়াদি নিম্ন মহাবিদ্যালয় কোর্স সম্পন্ন করে শিক্ষণ সনদ অর্জন করতে হয় এবং তারপর টিচিং সার্ভিস পরীক্ষায় পাশ করতে হয়। আর আমাদের দেশে নূন্যতম উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তির্ণ হলেই একজন সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষাকতার যোগ্যতা অর্জন করে। বেসরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কথা বাদই দিলাম। সন্তানকে কিভাবে লালন পালন করতে হয় তা মাকে শিখিয়ে দেওয়া লাগে না, হয়তো এই ভরসাতেই ৬০% মহিলা শিক্ষক নিয়োগ প্রথাও আছে আমাদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। আমি অবশ্য ব্যক্তিগতভাবে শিক্ষক নিয়োগে কোনো কোটা থাক তা মানতে রাজি নই। আমার প্রশ্ন হলো এই মায়েরাও কী তাদের সন্তানদের কৌতূহলী তৃষ্ণা ধরে রাখতে পারছে?

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১) ১৯৩০ খ্রিষ্টাব্দে ৭০ বছর বয়সে রাশিয়া ভ্রমন করে তাদের শিক্ষা ব্যবস্থা দেখে অভিভূত হয়েছেন। আমাদের সন্তানদের অবস্থা প্রসঙ্গে আফসোস করে বলেছেন, ‘ওরা কোনোদিন জানতে চাইতে শেখে নি- প্রথম থেকেই কেবলই বাঁধা নিয়মে ওদের জানিয়ে দেওয়া হয়, তার পরে সেই শিক্ষিত বিদ্যার পুনরাবৃত্তি করে ওরা পরীক্ষার মার্কা সংগ্রহ করে।’ (রাশিয়ার চিঠি, পৃ. ৩০)। একই গ্রন্থে তিনি আরো বলেছেন, ‘যে শিক্ষা আমাদের দেশে প্রচলিত তাতে করে আমাদের চিন্তা করার সাহস, কর্ম করবার দক্ষতা থাকে না; পুঁথির বুলি পুনরাবৃত্তি করার ’পরেই ছাত্রদের পরিত্রাণ নির্ভর করে।’ (পৃ. ২১)। আমাদের সন্তানদের আমরা যতটা শিক্ষার্থী হিসেবে গড়ে তুলছি তার চেয়ে অনেক বেশি পরীক্ষার্থী হিসেবে গড়ে তুলছি। তাইতো পরীক্ষার আগের রাতে বাবাকে ছুটতে দেখা যায় প্রশ্ন ফাঁসের কোনো তথ্য পাওয়া যায় কি না। সন্তানের অযোগ্যতা সত্ত্বেও ছুটতে দেখা যায় বৃত্তি পাওয়ানোর অনৈতিক দৌড়ে। আছে টিউশন মাস্টারের এ + পাওয়ানোর গ্যারান্টিসহ আগামী সমৃদ্ধ ব্যাচের আকাক্সক্ষা। পরনির্ভরশীল ভবিষৎ প্রজন্ম গঠনে আমরা সবাই ছুটছি অক্লান্ত।

প্রমথ চৌধুরী বলেছেন, ‘সুশিক্ষিত লোক মাত্রই স্বশিক্ষিত।’স্ব-শিক্ষায় শিক্ষিত হতে হলে নতুনকে জানার দুর্বার তৃষ্ণায় অতৃপ্ত থাকতে হবে। অতৃপ্ত জ্ঞানের তৃষ্ণায় যদি আমাদের বিদ্যালয়ের শিশুদের তৃষ্ণার্ত করতে পারি তবেই তাদের মনে জাগবে কৌতূহল, প্রশ্নের সীমাহীনতা। যদি কোনো প্রশ্ন না থাকে তবে নতুন কিছু জানার আগ্রহ থাকে না। শিশুর মনে প্রশ্ন জাগাতে হবে, সমস্যা সমাধানে তাকে ভাবাতে হবে, তবেই সে হবে জ্ঞান তৃষ্ণার্থী। যত বেশি প্রশ্ন, তত বেশি জানার প্রচেষ্টা, তত বেশি যুক্তি নির্ভরতা। এই যুক্তিনির্ভর জ্ঞানই সুশিক্ষা, যা ছাড়া মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা অসম্ভব।

১৪ ডিসেম্বর ২০১৭, খুলনা।

যদি মনে করো

যদি মনে করো
তোমায় আমি বন্দী করবো,
আমার কাছে খর্ব হবে তোমার সকল স্বাধীনতা ,
তবে তুমি ডানা মেলো,
আমি সুখে তোমার সুখি হবো।

কিন্তু যদি কোনো ব্যাধের হাতে পড়ো ধরা,
শিকারের লালসায় লালায়িত যার জিহ্বা,
জেনো, তোমায় আমি বন্দী করতে চাইনি,
হাতে আমার ফুলের শৃংখল।

ফিনিক্স অনুভূতি

আমাদের ফিনিক্স অনুভূতিগুলো উড়ে যায়—খুঁজে নেয় নতুন কোনো প্রাণ,
ছেড়ে এই পরিচিত মন, বাসা বাঁধে নতুন কোনো বক্ষে,
অথবা পুনর্জন্ম হয় তার ছাই রঙে, ডানা মেলে গায় গান
শৈশব হতে কৈশরে অথবা যৌবন হতে বার্ধক্যে।

শব্দের চেয়ে প্রাচীনতম অনুভূতিও থেমে নেই,
অথচ পুরাতন নয় তারা—সনাতন ধারা মেনে যায় ব’য়ে,
যায় ব’য়ে সময়ের সঙ্গ পেয়ে—যত প্রাণ তত প্রাণেই
খৃষ্টপূর্বাব্দ থেকে খৃষ্টাব্দে অথবা আর কোনো সময়ে।

আগস্ট ১৭, ২০১৭
অগ্রণি ব্যাংক টাউন, গল্লামারী, খুলনা।

চিঠি-৫

ওগো বসন্তের কুহেলী,
শীত বসন্তের এই মধুময় ক্ষণে তোমার কথা আমার মনের তন্ত্রীতে সাড়া জাগালো। তাই কিছু লিখতে বসা। এই, বলোনা গো কেমন আছো? নিশ্চয় ভালো। কারণ সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে তুমি অদ্বিতীয়া। আর তোমার সেই ‘ওকে’ বাবুর খবর কী? প্রার্থনা করি, ‘ওকে’ বাবুর ভাগ্য সুপ্রসন্ন হউক।

পৃথিবীতে আগমনের তারিখটি তোমার মনে আছে তো? নাকি নববর্ষকে অভিনন্দন জানানোর মতো ভুলেই গেছো? কিন্তু জেন আমার হাজারো ব্যস্ততার মাঝেও ঐ দিনটিকে ভুলি নি। মনে আছে সেই স্মরণীয় ’৮৮ সালের কথা; যে বছরের মার্চ মাসটা তুমিই শুরু ক’রেছিলে? আজ তুমি অষ্টাদশে অধিষ্ঠীতা। কিন্তু একবারো ভেবেছো তোমার মনেজগতের বয়স কত? আমার তো মনে হয় অনেক বেশী; নয়লে আমাকে এতো উৎসাহ যোগাবে কিভাবে? তাই অবুঝের মতো তোমাকে জন্মদিনের অভিনন্দন জানাচ্ছি। হয়তো আমার এই অবান্তর কথাগুলি তোমার সময়ের টানে ভালো লাগবে না। আমি তো রবি ঠাকুর বা নজরুল নই যে আমার কলমের তুচ্ছ খোঁচা তোমার মনে দাগ কাটবে।

আর একটি কথা, যদি একটি মুহূর্তের জন্যেও তোমার ভালো চেয়ে থাকি তবে আমার সবচেয়ে বড় চাওয়াটি পুরণ কোরো। আর সেটা হ’লো “তোমার সবোর্ত্তম রেজাল্ট”। আমার হয়তো আর কোনো চাওয়া থাকবে না। আমার জন্য না হোক অন্তত “ওকে” বাবুর জন্য।

আমার জীবনের একটি সফল গন্তব্য পেতে আমি মনে করি অনুল্লেখিত জনের বাইরে একজনের কাছ থেকেই সবচেয়ে বেশী অনুপ্রেরণা পেয়েছি আর সেটি একমাত্রই তুমি। আসলে তুমিই আমার প্রকৃত বন্ধু যে আমার জীবনে প্রতিটি পদে পদে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে প্রকৃত বাস্তবতার সাথে। তুমি আমাকে অনেক কিছু শিখিয়েছো, শিখিয়েছো কিভাবে অসীম চাওয়ার মাঝ থেকে নিজের চাওয়াটাকে পাওয়ায় পরিনত করতে হয়। এর জন্য আমি তোমার কাছে চিরকৃতজ্ঞ এবং আজীবন সেটা অক্ষুন্ন থাকবে বলে আমি আশাবাদী।

মানুষ পরিবর্তনশীল। কিন্তু পরিবর্তনের দ্রুততা যত অসহনের যন্ত্রনাও তত বেশি। তারপরও সবকিছুই এক সময় শান্ত হয়। নতুন বছরের শুরুটাই ক’রেছিলাম তোমাকে অভিনন্দ জানানোর মধ্য দিয়ে কিন্তু আমি কত স্বার্থপর, আমি নিজেই ভেবে অবাক হ’য়, যে তেমনি কোনো প্রতিত্তরের অপেক্ষায় আমি প্রহর গুনছিলাম। অথবা কে না তা করে। কিন্তু বাস্তব আমার ভাগ্যকে কতটা দূরে রেখেছে সেটা পাবার থেকে মাঝে মাঝে ভাবি। আসলে আমার ভাগ্যটাই হয়তো এমনি। যখনি কোনো দুর্লভ লাভের জন্য প্রাণপণে চাই তখনই সেটা আমাকে ফাঁকি দেবার জন্য পথ খোঁজে এবং অবশেষে সেই সফল হয়। অথবা আমি বুঝিই না কোনটা সুলভ আর কোনটা দুর্লভ। আসলে দুর্লভ তো দুর্লভই। না দেওয়াটাই তো তার প্রকৃতি।

জীবনে যতটা দুঃখ থাক না কেন অনুভবে সেটাই সবচেয়ে বেশী, তাই সব সময় চেষ্টা কোরো সুখটাকে বেছে নিতে কারণ দুঃখ এমনিতেই আসে, তাকে অর্জন করতে হয় না ।

জন্মদিন, চিঠি-৩

ফাল্গুন ১৭, ১৪১৬; সোমবার। তুই হয়তো বলবি একদোমই অন্যরকম ছিল না দিনটি। তাছাড়া ছুটির দিনও নয়। সেই কাক-সকালে ঘুম থেকে ওঠা। আগের মতোই ৯টায় অফিসে যাওয়া। সারা দিন কাজ আর কাজ। অফিস থেকে প্রতিদিনের মতো বাসায় ফেরা। সবই যেন নিত্যনৈমিত্তিক।

কিন্তু আমি বলবো দিনটি কোনোভাবেই আগের যে কোনো দিনের মত ছিল না। সেদিন সূর্যটা ছিল নতুন। সেদিন ফাগুন ছিল পূর্ণ। সেদিন প্রকৃতির শিক্ততা ছিল প্রেয়সীর হাতের মতো। সবকিছুতেই ছিল নতুনের ছোয়া। অনুভূতি যেন নতুন জামা পরে নেচেছিল। সেদিন ছিল সব ভালোলাগার দিন। সেদিন ছিল সুহাসিনীকে কাছে পাবার দিন। সেদিন ছিল ১৯৯৪ থেকে শুরু হওয়া ১৬ বছরের পূর্ণ দিন; সুহাসিনীর আবির্ভাব তিথি।

সংবাদটি জেনেছিলাম সাবলিল অপরাধের পূণ্যফলরূপে সুহাসিনীর মুঠোফোনের একটি বার্তা পড়ার মাধ্যমে। স্বার্থপরের মতো একাকী এই হৃদয়ের সকল কার্পণ্য ছেড়ে পূর্ণ ক’রে অনুভব ক’রেছিলাম দিনের সকল আনন্দকে। ব’লেছিলাম আজ আমি কারো কথা ভাববো না। দিনটি শুধুই আমার। তুইতো জানিস এমন শুভক্ষণে শুভকামনা জানাতে আমি কতটা কৃপণ। কিন্তু সেদিন আমি সত্যিই কবি হ’য়ে উঠেছিলাম। হৃদয় দিয়ে অনুভব ক’রেছিলাম সকল কবিতা। সেদিন আমি এতটুকুও কৃপণতা ক’রি নি।

কাউকে একাকী এভাবে শুভকামনা করার সুযোগ বা সদিচ্ছা কোনোটাই আগে আসে নি। প্রত্যাশার পথে প্রাপ্তি হিসাবে দোকানে যাই কিছু কেনা যায় কিনা তাই। কিন্তু কিছুতেই মন তুষ্ট হ’চ্ছিল না। সেখানে গ্রহনের মত একমাত্র কলমই ছিল। সে বস্তুটাই ধন্য হ’লো। তবে আশ্চর্য লেগেছে ফুলের সমাহারটা। মনে হলো আমার যে আজ ফুলের খুব বেশি প্রয়োজন তা দোকানী যেন আগে থেকেই জানতো। সেখান থেকে রজনীগন্ধা ও গোলাপ নিলাম। এখন শুধু দ্রুত বাড়ি ফেরার তৃষ্ণ। উপভোগের আশায় আকাঙ্খার সময় যেন কাটতেই চাইছিল না।

পূর্ণিমা’র পরের রাত তাই রূপসী চাঁদও ছিল কার্পণ্যহীন। যান্ত্রিক আলো নিভিয়ে নেমে এলাম চন্দ্রপ্লাবিত আঙিনায়। মুখোমুখি হাতে তার রজনীগন্ধা আর গোলাপের পশর তুলে দিয়ে খুব সাদাসিধাভাবেই ব’ললাম, “শুভ জন্মদিন”! প্রতিত্তর এলো সুহাসিনীর সলজ্জ সু-হাসিতে। বাধঁভাঙা চাঁদের হাসির উছলে পড়া আলোতে ইন্দ্রনীলের কণ্ঠ বেয়ে রবীঠাকুর নেমে এলেন আমার আঙিনায়। গেয়ে উঠলেন…

“চাঁদের হাসির বাঁধ ভেঙেছে, উছলে পড়ে আলো
ও রজনীগন্ধা, তোমার গন্ধসুধা ঢালো।….”

হাতে হাত রেখে অমর হ’লাম অমর সে সুরের মূর্ছনায়, অনুভূতির মৌনতায়, চন্দ্রীমার সীমাহীনতায়।

নশ্বরতাই সবকিছুকেই সৌন্দর্য দান করে। প্রাপ্য প্রাপ্তি হ’লে ধীরে ধীরে আগ্রহ কমতে থাকে। আকাঙ্খার সৌন্দর্যকে অটুট রেখে চাঁদও সেদিন বিদায় নিল অগোচরেই।

ফাল্গুন ২১, ১৪১৬
মার্চ ৫, ২০১০ শুক্রবার।

চিঠি-২

কল্যানীয়াসূ
তোমার চিঠি পেয়েছি। হয়তো ভালোই আছো, অন্তত সেটুকু আশা করতে হই-ই বৈ কি যখন সাধ আর সাধ্যের সঙ্কুলান হই না তোমাক দেখার। অনকেদিন হলো তোমাকে লেখা হয় না। এখন এই মোবাইল-মেছেজের যুগে চিঠির অবস্থান বইয়ের পাতা আর জাদুঘরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ হ’তে চলেছে। কাগজ আর কলমের ঘাটতি না থাকলেও বাড়তি কথাও আর লেখা হই না কেননা আজ আমরা সময়, শব্দ আর অর্থের কাছে বন্ধী হ’য়ে যাচ্ছি ক্রমে ক্রমে। তাই অনুভূতিও পাচ্ছে সীমাবদ্ধতা।

০৩০৯০৯

গীতশ্রী, চিঠি-৪

শনিবার রাতেই পৌছি বৌদিদের বাড়ি। এখানে আমার কিছু ক্ষুদে ভক্ত আছে। তার দু’একটি কথা তোকে বলবো আজ। একজনের নাম গীতা। আমি ডাকি গীতশ্রী। সে আমাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে। তা কোনো ভাষা দিয়ে বোঝাতে গেলে অপূর্ণ থেকে যাবে। আসলে এই ছোট্ট সুন্দর মন নিয়ে এর থেকে বেশি হয়তো আর ভালোবাসা যায় না।

আমি যখন ওদের বাড়ি পৌছায় গীতশ্রী রাস্তায় দাড়িয়ে অপেক্ষায় এবং আমার চেতনার একটুকু বাকি থাকতেও আমাকে আড়াল করেনি। আমার সাথে খাওয়া, যাওয়া, বিশ্রাম, সবই। খুবই লাজুক এবং সেবাপরায়ন। এই বৈশাখী রুক্ষ প্রকৃতিতে সে তালপাখা হাতে সদা ব্যস্ত। দেখে বোঝা যায় না, কিন্তু আমি টের পাই। ধরা পড়ে আমার চোখে।

আমি আসার পরই হাত পা ধোয়া জল আনা, লুঙ্গি গামছা এগিয়ে দেয়া, হাতপাখা দিয়ে বাতাস করা, ইত্যাদি কাজে তার ব্যস্ততা শুরু হয়। আমি যখন শুয়ে থাকি সে বাতাস করে আমার নিষেধ সত্ত্বেও। এই বাতাস করা কিন্তু গোপনে। কেউ আসলেই সে নিরব। নিরালায় সচল হয় বাতাসের প্রবাহ।

আজ কী করেছে শোন। আমি কালিগঞ্জ গিয়েছিলাম বৈশাখের নববর্ষাতে মুরগীভেজা হ’য়ে। সে ব্যস্ত হয়ে গামছা-লুঙ্গি এনে হাতে দিল। চিরুনি দিয়ে পরিপাটি করে দিল চুল। তারপর গোপনে জানতে চাইল পিঠা খাবো কিনা। আমি ব্যাপারটা প্রথমে গুরুত্ব দেয়নি তার মাঝে মাঝে বলা পিঠার বিষয়টা। পরে তার মাধ্যমে জানতে পারলাম যে তার মা পিঠা বানিয়েছে এবং সেটা আমাকে খাওয়াতে তার খুব মন চাইছে। বললাম নিয়ে এসো হাতে করে একটা পিঠা। সে এনে দিল এক প্লেট সাজিয়ে। এটটু পরেই সে একটি কাঠি লজেন্স এনে দিল। হাতের মধ্যে থেকে লজেন্সটি গরম হয়ে রয়েছে। উৎস জানলাম আজ বিকালে বাজারে গিয়ে সে বায়না করে নিজে খাবে বলে এই লজেন্সটি বাগিয়েছে। সেটাই আমাকে দিয়ে সে কৃতজ্ঞ। আমি এতো বেশি আশ্চর্য হলাম যে নিরব হয়ে রইলাম। জানি না তার কাছে ভালোবাসা কী? কী তার অনুভূতি। মাত্র তৃতীয় শ্রেণির গীতশ্রী।

২৬ এপ্রিল, ২০১০ খ্রিঃ
সোমবার, ভাটপাড়া, কালিগঞ্জ।

মেঘের সঙ্গমে চাঁদ

অস্তগামী সূর্যের দিকে পিঠ ফিরিয়ে
একাকী বসে থাকি নবগঙ্গার তীরে,
মেঘের সঙ্গম থেকে বের হয় চাঁদ,
তোমার ছবি ভাসে স্বচ্ছ-সরিৎ-নীরে,
ম্লান চাঁদোয়া স্মৃতির পরশ বুলিয়ে
খুলে দেয় হৃদয়ের দ্বার—তার স্বাদ
তৃষ্ণার্ত করে আরো—আকণ্ঠ আনমন!
ঝ’রে পড়া জ্যোৎস্নার মতো সারাক্ষণ

তোমার নরম মন হৃদয় আমার
ছুঁয়ে থাকে—আমি তাতে চেয়ে থাকি, আর
চাঁদোয়ার রঙে আঁকি তোমার আদল,
শ্যাওলার ফাঁকে ফাঁকে চিকচিকে তুমি
চেয়ে থাকো— হারাও— ফের কুসুম চুমি
দেখা দেও— আমি চেয়ে থাকি, বিহ্বল!

 

বৈশাখ ১৬, ১৪১৬: এপ্রিল ২৯, ২০১০
বৃহস্পতিবার, গঙ্গারামপুর।

নিশাচর প্রেমিক

সীমাহীন আঁধারের মাঝে তুমি আমি
দুটি তারা— ভালোবাসার অমৃতসুধা
যেচে যাই এই হৃদয়ের দ্বার চুমি,
যত করি পান— মেটে নাকো তার ক্ষুধা,
অধর প্রান্ত ছুয়ে অসীম অজানায়
ভেসে যাই অনুভূতির বাচালতায়।

নিজের ঘরে আমি নিজেই সিঁদ কাটি
নিজ্জুম নিরালায়— হৃদয়ের ভয়
দেহে আনে বল—সকল ভীরুতাটি
আঁধারের গায়ে তাই নিমিশে মিলায়,
ভালোবাসার পাত্র ভ’রি অমৃত ক্ষুধায়,
জেগে থাকি তুমি আমি— পৃথিবী ঘুমায়।

আঁধারের গায়ে তবু টোকা নাহি লাগে,
নাহি জানে আর সব নারদের দল,
নিশিথ ভ্রমর ভ্রমি তপঃমনবাগে,
সুধা পানে তৃষা বাড়ে হৃদি দুর্বল।

আঁধারের আছে বাকি আর কিছুক্ষণ,
অমৃত পানে প্রিয়া ক’রো না বারণ
লুটায়ে প’ড়ো না আর মূর্ছনার প্রায়,
দেখ না আঁধার-সীমা মুছিবারে ধায়।

শিশির কণা তোমার শিরদেশ স্মরি
পুরাবে অমৃতের খেদ রবি কর বরি,
তখন তোমাতে আর হবে না মিলন,
নিশাচর প্রেমিক তোমার লোকভীরু মন।

জ্যৈষ্ঠ ২৩, ১৪১৮: জুন ৬, ২০১১
সোমবার, কালিগঞ্জ।